৬ বছর পর খুলছে নাথু-লা পাস, আগস্টে ফের শুরু ভারত-চিন সীমান্ত বাণিজ্য

৬ বছর পর খুলছে নাথু-লা পাস, আগস্টে ফের শুরু ভারত-চিন সীমান্ত বাণিজ্য

দীর্ঘ ছয় বছর পর ফের খুলতে চলেছে ভারত-চিন সীমান্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ নাথু-লা পাস। আগস্ট মাস থেকেই সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করায় এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় সড়ক ও রেল পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজও দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে।

নাথু-লা পাস ভারতের সিকিমকে তিব্বতের সঙ্গে যুক্ত করা প্রাচীন সিল্ক রুটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধের পর বহু বছর এই পথ বন্ধ ছিল। পরে ২০০৬ সালের ৬ জুলাই সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালু হলেও ২০২০ সালে করোনা মহামারীর কারণে আবার তা বন্ধ হয়ে যায়। এবার প্রায় ছয় বছর পর ফের এই ঐতিহাসিক বাণিজ্যপথ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ভারত ও চিনের মধ্যে হিমালয় অঞ্চলে সীমান্ত বাণিজ্যের জন্য দুটি প্রধান পথ রয়েছে—সিকিমের নাথু-লা এবং উত্তরাখণ্ডের লিপুলেখ পাস। প্রতিবছর সাধারণত মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ছয় মাস নাথু-লা দিয়ে বাণিজ্য পরিচালিত হয়। এই পথের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ৬০০ ভারতীয় ব্যবসায়ী এবং সিকিমের বিপুল সংখ্যক পরিবহনকর্মী। তিব্বত থেকে এই রুটে কাঁচা রেশম, পশম, ইয়াকের লোম এবং বিভিন্ন হস্তশিল্পজাত সামগ্রী ভারতে আসে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গিয়েছে, সীমান্ত বাণিজ্য পুনরুদ্ধারের বিষয়ে গত বছর দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ইতিবাচক আলোচনা হয়। এরপর চলতি বছর ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের চিন সফরের পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে নতুন করে উদ্যোগ শুরু হয়। সেই ধারাবাহিকতায় নাথু-লা, শিপকি-লা এবং লিপুলেখ দিয়ে সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালুর প্রস্তুতি জোরদার হয়েছে।

বাণিজ্য আরও সহজ করতে সিকিমে রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেভক-রংপো রেল প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ভবিষ্যতে এই রেললাইন নাথু-লা পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি রংপো-গ্যাংটক অংশের সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এবং গ্যাংটক থেকে নাথু-লা পর্যন্ত রেল সংযোগের সম্ভাব্য রুটও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সড়ক যোগাযোগ উন্নত করার লক্ষ্যেও একাধিক প্রকল্প চলছে। রংলি থেকে মেনলা পর্যন্ত নতুন সড়ক নির্মাণের কাজ এগোচ্ছে। এছাড়া জাতীয় সড়ক ৭১৭-কে বিকল্প রুট হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে ভূমিধসের কারণে জাতীয় সড়ক ১০ বন্ধ থাকলেও সীমান্ত এলাকায় যোগাযোগ বজায় রাখা যায়।

সরকার ইতিমধ্যেই সীমান্ত সংযোগ আরও শক্তিশালী করতে উল্লেখযোগ্য অর্থ বরাদ্দ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিকাঠামো উন্নয়ন শুধু সীমান্ত বাণিজ্য নয়, কৌশলগত এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

অতীতের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬ সালে নাথু-লা পথে প্রায় ৮২.৬৮ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছিল। ডোকলাম অচলাবস্থার পর সেই পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। পরে কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও করোনা পরিস্থিতির কারণে ২০২০ সালে বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সীমান্ত এলাকার ব্যবসায়ী ও পরিবহন খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে।

যদিও নাথু-লা দিয়ে হওয়া বাণিজ্যের পরিমাণ ভারত-চিনের মোট দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের তুলনায় খুবই কম, তবুও এর কৌশলগত ও কূটনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বাণিজ্যপথ পুনরায় চালু হওয়া দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকার অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন